'মতামত'

‘শুধু দালানকোঠা-রাস্তাঘাট তৈরি মানেই উন্নয়ন নয়’

ডা. মোহাম্মদ আল-মামুন | ০১ মে ২০২০ | ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
অ+ অ-
মনে করেন আপনার দুটি ভাই আছে অল্পশিক্ষিত। আপনি উচ্চশিক্ষিত এবং ভালো উপার্জন করেন। এক্ষেত্রে আপনি কি করবেন? নিশ্চয়ই ভাবছেন, এর উত্তর খুবই সোজা। “তাদেরকে ভরণ-পোষণ করবো, তাদের জন্য কিছু করে দিবো, অথবা ভালো ভিসা দেখে কোন একটা দেশে পাঠিয়ে দিবো”।
ঠিক এখানটায় আপনি মারাত্মক একটি ভুল করলেন।
আপনি একটু ভিন্নভাবে ভাবেন। বিদেশে না পাঠিয়ে দিনমজুর হিসেবে অথবা বাৎসরিক শ্রমিক হিসেবে অন্যের বাড়িতে দিয়ে দিলেন অথবা এরকম করার পরামর্শ দিলেন।
সেক্ষেত্রে আপনার অনুজ কি ভাববে আপনাকে নিয়ে? নিশ্চয়ই ভালো কিছু নয়। আপনাকে খারাপ কিংবা বাজে পরামর্শক মনে করবে সবাই।
আচ্ছা বলেন তো, বিদেশে শ্রমিক হিসেবে পাঠানো আর দেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার মূল পার্থক্য কোথায়?
পার্থক্য শুধু টাকার পরিমানে, আর কোথাও কোন পার্থক্য নেই। দু’জায়গাতেই মজুর হিসেবে কাজ করবে। দিনমজুর হলে খরচ বেশি দিতে হয়, তাই ওরা আপনাকে রাখবে মাসিক বেতনে। আর আপনার ও মাসিক বেতনই দরকার কেননা তাতে আপনার চাকুরির সিকিউরিটি বাড়বে।
আদতে এই দুটি জায়গাতেই আপনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। আপনার চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম সব কিছুই আর আট-দশজন শ্রমিকের মতোই আবর্তিত হবে। আপনি যদি ভালো পারিবারিক শিক্ষাও পেয়ে থাকেন তা-ও এখানে থেকে থেকে বদলে যাবে।
তাই আমি বলি আপনার নির্ভরশীল অল্পশিক্ষিত/অশিক্ষিত ভাইটিকে অন্যের খাটানো শ্রমিক না বানিয়ে নিজেই খাটান যে কোন কাজে। প্রয়োজনের বেশি খাটান তবুও হাতছাড়া করবেন না অন্য জায়গায়। কেননা সে যদি আপনার হাতছাড়া হয়ে যায় তবে তার সকল চিন্তা-চেতনা, কার্যক্রম অন্য আর দশজন শ্রমিকের মতোই আবর্তিত হবে এবং সেখান থেকে বের হতে তার আরো দুই/তিন পুরুষ লেগে যাবে।
আপনি আপনার প্রয়োজনমতো তাকে কৃষিকাজই করান আর যে কোন কাজই করান শুধু দিনশেষে তার পরিবারটা দেখেন, তবে তার জেনারেশন আপনার জেনারেশনের কাছাকাছিই থাকবে, আকাশ-পাতাল পার্থক্য হবে না। সেও কয়েক পুরুষ পিছনে পড়ে যাবে না।
এক্ষেত্রে আপনি সুন্দর একটি বংশ তৈরী করতে পারবেন, যারা সবাই প্রতিষ্ঠিত হবে একদিন। আপনার এই বংশ কয়েকশ বছর কিংবা কয়েক হাজার বছর টিকে থাকতে পারবে সগৌরবে।
এবার আসেন কাজের কথায়। এই চিত্রটি দিয়েই একটি দেশের ছবি আঁকি, যেখানে আমাদের শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত শ্রেণী রয়েছে। এবার দেখেন আমরা কি করছি।
আমরা শিক্ষিতগুলো ঘরে রেখে অশিক্ষিতগুলোকে বিদেশ পাঠাচ্ছি  শ্রমিক হিসেবে। সব অদক্ষ লোকজন ওখানে শ্রম দিয়ে নগদ কিছু টাকা পাঠাচ্ছে আর তাদের জীবন শ্রমের চাকায় আবর্তিত হবে কয়েক পুরুষ ধরে। এ উন্নয়ন মেকি।
এটি সামাজিক ভারসাম্য ভয়ংকরভাবে নষ্ট করে। নতুন করে বড় হতে শেখায় না বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে। আবার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী  ও প্রয়োজন মাফিক দক্ষ না হওয়ায় বিদেশি কয়েক লক্ষ দক্ষ লোকজন এসে নিয়ে যায় বিশাল পরিমান টাকা, যা আমাদের কোটি শ্রমিক নিয়ে আসে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে।
সবশেষে এদেশের জনগণের লাভ কি হলো?
আমরা যদি আমাদের অদক্ষ শ্রমিকগুলো কৃষিকাজে লাগিয়ে কিছু ট্রেনিং দিয়ে কাজ করাতাম তবে কোন জমিই অনাবাদি থাকতো না। কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগালে কৃষিও একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা হতে পারতো।
আমাদের অল্পশিক্ষিত লোকজনকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে পাঠালে দালাল ফরিয়াদের উপার্জন কমে যেতো, আর অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসতো। বিদেশে তাদের দাম ও থাকতো ভালো এবং হুট করে ছাঁটাই হতো না। দক্ষ লোকজন আমাদের ইন্ডাষ্ট্রিগুলোতে কাজ করলে বৈদিশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো অনেক। যা এখন নিয়ে যাচ্ছে বিদেশিরা।
আমাদের সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা দেশকে দিতে পারছে খুব সামান্যই।
আমাদের কোন প্ল্যান নেই দেশ নিয়ে।
শুধু দালানকোঠা রাস্তাঘাট তৈরী মানেই উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন হতে হয় আত্মিক পর্যায়ে।
প্রতিটা স্টেপে উন্নয়ন না হলে এটি কখনোই টেকসই হয় না। যে কোন সময় হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পরতে পারে। যে সম্ভাবনা আমরা দেখছি আগামি কয়েক বছরে। কেননা আমাদের অদক্ষ শ্রমিকের কাজগুলো ওরা এখন নিজেরাই করবে এবং শ্রমিকগুলো ছাটাই করে দেশে ফেরত দিবে। করোনা পরবর্তী সময়টুকু আমাদের জন্য ভয়াবহ বেদনার হতে পারে।
জাতিগঠন কোন কঠিন কাজ নয়। দরকার শুধু এ জাতির মানুষগুলোর  প্রতি এক টুকরো নিঃশর্ত ভালোবাসা। যে ভালোবাসা আছে আপনার ভাইয়ের প্রতি, বোনটির প্রতি। যে ভালোবাসায় আপন ভাবা যায় দেশের সকল মানুষকে।
লেখক : ডা. মোহাম্মদ আল-মামুন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, বাঞ্ছারামপুর।

Facebook Comments

পড়া হয়েছে 988 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
x