২০ পরিবারের চলার পথ বন্ধ করে দিলেন এক স্কুল শিক্ষক

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক | ২৩ অক্টোবর ২০২০ | ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
অ+ অ-

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারই প্রতিবেশী ২০ পরিবারের হাঁটার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শত বছরের পুরনো ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের ওই পথ বন্ধ করতে সেখানে তিনি প্রায় ৩০ ফুট জায়গা জুড়ে পাকা দালান ও বাকি জায়গায় টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন।এতে ওই শিক্ষকের বাড়ির পূর্ব ও উত্তর দিকের প্রায় ২০টি পরিবারের মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে বিকল্প পথ হিসেবে অন্য বাড়ির উপর দিয়ে চলাচল করছেন।

অভিযুক্ত শিক্ষক রাম চন্দ্র দাস সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের বড়ইচারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

ওই শিক্ষকের বাড়ি লাগোয়া পূর্ব পাশের বাড়ির বাসিন্দা স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক বাদল দাস জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে তারা জনৈক নয়নতারা দাসীর কাছ থেকে ২১৯৭ দাগের আট শতক জায়গা কিনে বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে নয়নতারা দাসীর পূর্বসূরী উমাকান্ত দাস বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তার জন্য পশ্চিম পাশের বাড়ির তৎকালীন মালিক রামধন দাস ওরফে রায়ধন দাসের (রাম চন্দ্র দাসের কাকা) সঙ্গে আদালতে একটি সুলেহনামা করেন। ওই সুলেহনামার শর্ত অনুযায়ী, রামধন দাসের ৫ ফুট প্রস্থ ও ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের জায়গা রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করার বিনিময়ে তাদেরকে এক শতক জায়গা দিয়ে দেন। এরপর থেকে এটি পুরো মহল্লার মানুষের পায়ে হাঁটার রাস্তা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি রাম চন্দ্র দাস ইটের দেয়াল ও টিনের বেড়া দিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন।

বাদল দাস আরো জানান, তারা রাস্তার বিষয়টি সমাধানের জন্য গত ১৪ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৪ ধারার মামলা করেন। বিষয়টি জমি সংক্রান্ত হওয়ায় আদালত এটিকে ১৪৫ ধারায় রূপান্তর করে বিবাদী পক্ষকে কারণ দর্শাতে বলেছেন। এছাড়া এই জায়গাটি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আগামি ২৩ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪৪ ধারার মামলার আদেশ পাওয়ার পর শিক্ষক রাম চন্দ্র ও তার গোষ্ঠীর লোকেরা বাদল দাস ও তার স্বজনদেরকে মারধরের হুমকি দেন। এতে বাদল দাস বাদি হয়ে পরদিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার‌্যবিধির ১০৭ ধারায় রাম চন্দ্রসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

এদিকে পরদিন সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে স্থানীয় অরুয়াইল তদন্ত কেন্দ্রের একদল পুলিশ সরেজমিন গিয়ে দেয়াল নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখতে বলেন। পুলিশের বাধায় দেয়াল নির্মাণ বন্ধ রাখলেও রাতের অন্ধকারে তারা পুরো রাস্তাটি টিনের বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে দেয়।

এতেই ক্ষান্ত হননি শিক্ষক রাম চন্দ্র। তিনি গত ২০ অক্টোবর বাদল দাসের তিন ভাই, তার দুই মামা ও মামাতো ভাইদের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার‌্যবিধির ১০৭ ধারায় পাল্টা মামলা ঠুকে দেন।

বাদল দাস বলেন, বছর খানেক আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও অরুয়াইল গ্রামবাসী বেশ কয়েকবার এ বিষয়ের সুরাহা করার চেষ্টা করলেও শিক্ষক রাম চন্দ্র সাড়া দেননি। প্রায় ১০ মাস আগে বাদল দাস এ বিষয়ে সরাইল উপজেলা প্রশাসনের সহকারি কমিশনারের (ভূমি) কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টির সুরাহা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুই পক্ষকে নিয়ে নিজ কার‌্যালয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। ওই বৈঠকে ইউএনও’র দেয়া রায় অবজ্ঞা করেন শিক্ষক রাম চন্দ্র।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক রাম চন্দ্র দাস বলেন, আমার বাড়ি ২১৯৮ ও ২১৯৯ দাগে মোট ১৩ শতক। আমার বাড়ির চারদিকে বড়ই, নারকেলসহ বিভিন্ন গাছ আছে। এখানে রাস্তার কোন অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করেন তিনি। বলেন, ”যদি আমার প্রতিপক্ষ প্রমান করতে পারে যে, এখানে রাস্তা আছে, তাহলে আমি জুতা নিয়ে অরুয়াইল বাজারে ঘুরবো।”

মারধরের হুমকির বিষয় অস্বীকার করে তিনি বলেন, ”বাদল দাস ও তার লোকজন আমাকে গত বছরের জুনে মারধর করেছে। আমার কাছে হাসপাতালের ডকুমেন্ট আছে।”

আদালত কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারির পর বেড়া নির্মান করা আইনসিদ্ধ কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পুলিশ আমাকে ১৪৪ ধারার মামলার আদেশের কাগজ দেখাতে পারেনি। তারা বলেছে পরে কাগজ দেখাবে। এজন্য আমি বেড়া দিয়েছি।”

এদিকে অরুয়াইল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাপন চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ ১৪৪ ধারার মামলার আদেশের কাগজ দেখাতে পারেনি বলে যে দাবি করেছেন শিক্ষক রাম চন্দ্র দাস তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ, ওই শিক্ষকের স্বাক্ষরিত আদেশের রিসিভ কপি আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।

রাস্তা বন্ধ করার বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু এই রাস্তার বিষয়ে বাদিপক্ষ আদালতের শরনাপন্ন হয়েছেন, বিবাদিপক্ষও এটা ওয়াকিবহাল আছেন, সেহেতু বেড়া দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া তাদের ঠিক হয়নি।

Facebook Comments

পড়া হয়েছে 685 বার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
x